কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে জুয়েল মিয়া (২০) হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ছয় দিন পর আদালতে মামলা দায়ের হলেও প্রকৃত অপরাধীরা এখনো গ্রেপ্তার না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। একই সঙ্গে মামলায় নিরপরাধ ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে দাবি করে তাদের অব্যাহতি করেছেন তারা।
প্রকৃত খুনিদের দ্রুত গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও নিরপরাধীদের মুক্তির দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করছেন বড়চারা ও আশপাশের এলাকার মানুষ।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সন্ধ্যায় আগরপুর-পোড়াদিয়া সড়কের বড়চারা নতুন বাজার এলাকায় "১নং গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ" এর ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
এতে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের পাশাপাশি স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরাও অংশ নেন।
মানববন্ধনে উপজেলা বিএনপির তাঁত বিষয়ক সম্পাদক ও গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শামছুল আলম এলেম, উপজেলা ছাত্রদলের সিনিয়ার যুগ্ম আহ্বায়ক ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত সদস্য সচিব মো. ইমরান খান এবং শাহ্ আলমসহ নেতাকর্মী ও সাধারণ মানুষজন অংশ নেন।
এ সময় "জুয়েল হত্যার বিচার চাই", "প্রকৃত খুনিদের ফাঁসি চাই", "নিরপরাধদের হয়রানি বন্ধ করো"সহ বিভিন্ন স্লোগান দেওয়া হয়।
কর্মসূচিতে শামছুল আলম এলেম বলেন, আদালতে দায়ের হওয়া মামলার নকল সংগ্রহ করে জানতে পারি, আমাকে ১১ নম্বর আসামি করা হয়েছে।
একই মামলায় তার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছেলে মো. তৌকি মিয়া ২ নম্বর, ভাতিজা ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক মো. ছায়েম মিয়া ৮ নম্বর, ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. নাজিম উদ্দিন ১ নম্বর, তার ছেলে মো. সানি ৫ নম্বর এবং ৯ নম্বর আসামি মো. সোহান মিয়া ঘটনার সময় ঢাকায় অবস্থান করছিলেন বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, তাদের কেউই জুয়েল হত্যার ঘটনায় জড়িত নন। সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের শনাক্ত করে শাস্তির আওতায় আনা এবং নিরপরাধদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানান।
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য রাখেন উপজেলা বিএনপির স্বেচ্ছাসেবক বিষয়ক সম্পাদক মো. নাদিরুজ্জামান খসরু, স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক মো. মেজবাহুল হক খোকা, বিএনপি নেতা মো. সেলিম মিয়া, গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম, ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য সাফি উদ্দিন প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, প্রকৃত হত্যাকারীদের আড়াল করে নিরপরাধ মানুষকে হয়রানি করা হলে বিচারব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হবে। তাই নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তারা।
এর আগে শনিবার (১৮ জুলাই) একই স্থানে জুয়েল হত্যার প্রতিবাদে ও বিচার দাবিতে আরেকটি মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেও বক্তারা প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার এবং নিরপরাধদের হয়রানি না করার দাবি জানান।
উল্লেখ্য, গত ১০ জুলাই শুক্রবার বিকালে জুয়েল মিয়া তার এক বন্ধুর ডিমের গাড়িতে করে জাফরাবাদ মোড় থেকে লক্ষ্মীপুর বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। গাড়িটি গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের বড়চারা বাজারের প্রায় ১০০ গজ পশ্চিমে পৌঁছালে ওঁত পেতে থাকা একদল দুর্বৃত্ত গাড়ির গতি রোধ করে। পরে তারা জুয়েলকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে প্রকাশ্যে এলোপাতাড়ি মারধর করে। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
নিহত জুয়েল মিয়া গোবরিয়া-আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর বুধাইবাড়ি গ্রামের অটোরিকশা চালক মো. কুদ্দুস মিয়ার ছেলে। এলাকাবাসীর দাবি, লক্ষ্মীপুর ও বড়চারা এলাকার কয়েকজন যুবকের মধ্যে দীর্ঘদিনের বিরোধ থাকলেও জুয়েল সেই বিরোধের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। সম্পূর্ণ নিরপরাধ হয়েও তাকে প্রাণ দিতে হয়েছে।
হত্যাকাণ্ডের পর একাধিকবার মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হলেও কুলিয়ারচর থানা পুলিশ মামলা নিতে বিলম্ব করেছে বলে অভিযোগ করেন নিহতের স্বজনরা। পরে নিহতের বাবা মো. কুদ্দুস মিয়া বাদী হয়ে গত ১৬ জুলাই কিশোরগঞ্জের আমলগ্রহণকারী জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং-২ এ একটি মামলা দায়ের করেন।
মামলায় গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের বড়চারা গ্রামের মৃত ছাবুদ আলীর ছেলে স্থানীয় ৭ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. নাজিম উদ্দিন (৫৫) ও তার ছেলে মো. সানি (২২), মৃত ইসমাইল মাস্টারের ছেলে উপজেলা বিএনপির তাঁত বিষয়ক সম্পাদক ও গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শামছুল আলম (এলেম) (৫৫), তার ছেলে মো. তৌকি মিয়া (২০), ভাই মো. আসাদ উল্লাহর ছেলে মো. ছায়িম মিয়া (২০), আনসার ভিডিপি কমান্ডার মো. জামানের ছেলে মো. আসিফ মিয়া (২২), মো. হুমায়ুনের ছেলে মো. রনি (২১), মো. জসিম উদ্দিনের ছেলে মো. সাকিব মিয়া (২১), মো. জামাল মিয়ার ছেলে মো. সালমান মিয়া (২২), মো. ইব্রাহিমের ছেলে মো. সোহান মিয়া (২১), মো. দুলাল মিয়ার ছেলে মো. জিদনী মিয়া (২২), ইছু মিয়ার ছেলে মো. টুকুল মিয়া (২২), সবুজ মিয়ার ছেলে মো. সুমন মিয়া (২৩) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৭-৮ জনকে আসামি করা হয়েছে।
বাদী কুদ্দুস মিয়ার অভিযোগ, রহস্যজনক কারণে থানা পুলিশ মামলা গ্রহণ না করায় তিনি আদালতের দ্বারস্থ হতে বাধ্য হয়েছেন।
অন্যদিকে, বড়চারা এলাকার সাধারণ মানুষের অভিযোগ, প্রকৃত হত্যাকারীদের আড়াল করতে একটি প্রভাবশালী মহল রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত বিরোধকে সামনে এনে মামলাকে ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
তাদের দাবি, কোনো ধরনের রাজনৈতিক প্রভাব বা ব্যক্তিগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘাতকদের শনাক্ত করে দ্রুত আইনের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। সেটিই এখন কুলিয়ারচরের সাধারণ মানুষের একমাত্র প্রত্যাশা।