ঘোড়ার গাড়িতে বসে আছেন প্রধান শিক্ষক নূর হায়দার রায়হান। আর সেই গাড়ির পেছনে দৌড়ে চলেছে বিদ্যালয়ের ছোট ছোট শিক্ষার্থীরা। প্রিয় শিক্ষককে শেষবারের মতো বিদায় জানাতে কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর উপজেলার জ্ঞানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা গেল এক আবেগঘন ও ব্যতিক্রমী দৃশ্য।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) হিলচিয়া ইউনিয়নের ১৯৩৮ সালে প্রতিষ্ঠিত জ্ঞানপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নূর হায়দার রায়হানের অবসরজনিত বিদায় সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে আয়োজিত অনুষ্ঠানে শিক্ষক, অভিভাবক ও স্থানীয় বাসিন্দারা অংশ নেন।
বিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে ১৮৭ জন শিক্ষার্থী এবং প্রধান শিক্ষকসহ ১১ জন শিক্ষক রয়েছেন। নূর হায়দার রায়হান ২০০৯ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে এই বিদ্যালয়ে যোগ দেন।
দীর্ঘ ৪০ বছরের শিক্ষকতা জীবন শেষে তিনি অবসরে গেলেন। এর আগে তিনি একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সহকর্মীরা জানান, চার দশকের চাকরিজীবনে তিনি কখনো মেডিকেল ছুটি নেননি। সময়ানুবর্তিতা ও শিশুদের প্রতি অসাধারণ মমতার জন্য তিনি শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের কাছে সমানভাবে প্রিয় ছিলেন।
অনেক সময় প্রাক্-প্রাথমিকের শিশুরা তার কাঁধে চড়ে বসত, আবার হাত ধরে টেনে ক্লাসে নিয়ে যেত। শিক্ষক নয়, শিশুদের কাছে তিনি ছিলেন একজন কাছের বন্ধুও।
বিদায় অনুষ্ঠানে সহকারী শিক্ষক ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। অভিভাবকেরা বলেন, একজন আদর্শ শিক্ষকের জন্য এমন সম্মানই প্রাপ্য।
বিদায়ী বক্তব্যে নূর হায়দার রায়হান বলেন, শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়, এটি একটি ব্রত।” তিনি নতুন প্রজন্মের শিক্ষকদের নিষ্ঠা, সততা ও ভালোবাসা দিয়ে শিক্ষার্থীদের গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
আবেগঘন কণ্ঠে তিনি আরও বলেন, “আমার শেষ বেলায় এভাবে সংবর্ধনা জানাবে, তা কখনো কল্পনাও করিনি। বর্তমান ও সাবেক শিক্ষার্থী, তাদের পরিবার এবং এলাকার মানুষ যেভাবে আমাকে ভালোবাসায় সিক্ত করেছেন, আমার জীবনে আর কিছু চাওয়ার নেই। ভালো থাকুক আমার প্রাণের প্রতিষ্ঠান, ভালো থাকুক আমার সন্তানেরা।
জ্ঞানপুর এলাকার বাসিন্দা মাজহারুল ইসলাম ভূইয়া বলেন, তিনি নিজেও এই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিলেন, এখন তার মেয়েও এখানে পড়ে। তার ভাষায়, নূর হায়দার স্যার একজন নীতিবান, মানবিক ও দক্ষ প্রধান শিক্ষক। তাকে তার প্রাপ্য সম্মানে বিদায় দিতে পেরে আমরাও গর্বিত।
সহকারী শিক্ষক মেরিনা ইয়াসমিন বলেন, ১০ বছর একসঙ্গে কাজ করেও তিনি কোনো দিন স্যারকে দেরিতে বিদ্যালয়ে আসতে দেখেননি।
আরেক সহকারী শিক্ষক শ্যামল কান্তি গোস্বামী বলেন, বাজিতপুর উপজেলায় এমন রাজসিক বিদায় আয়োজন এই প্রথম। সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা এক মাস ধরেই প্রস্তুতি নিয়েছিল।
সাবেক শিক্ষার্থী আলী হাসান তামিম বলেন, পরিবারে যেমন মা-বাবা অভিভাবক, স্কুলে স্যারও আমাদের তেমনই একজন অভিভাবক ছিলেন। তিনি আমাদের সন্তানদের মতোই স্নেহ করতেন।
সরিষাপুর গ্রামের বাসিন্দা নূর হায়দার রায়হানকে ঘোড়ার গাড়িতে বিদায় জানানোর এই আয়োজনকে সহকর্মী ও স্থানীয়রা এলাকায় নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন।