ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ টক-মিষ্টি স্বাদের পুষ্টিকর ফল বাতাবি লেবু। লেবু জাতীয় ফলের মাঝে আকার-আকৃতিতে সব থেকে বড় ফল। শহর কিংবা গ্রাম ছোট-বড় সবার কাছে বেশ পরিচিত ও জনপ্রিয় ফল।
দেশের প্রায় সর্বত্রই কম-বেশি জন্মে। তবে বেশি জন্মে সিলেট, মৌলভিবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি, চট্টগ্রাম, ময়মনসিংহ, রংপুর, মেহেরপুর, পাবনা ও রাজশাহী এলাকায়।
অঞ্চলভেদে বাতাবি লেবু বিভিন্ন নামে পরিচিত- বাতাবিলেবু, জাম্বুরা, জামপোড়া, ছোলম, মাতু, মাতুয়া, তরুমজো ইত্যাদি। এর ইংরেজি নাম Pummelo, পরিবার Rutaceae, উদ্ভিদ তাত্ত্বিক নাম Citrus grandis। আদি নিবাস দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।
বাতাবি লেবু মাঝারি আকারের অর্ধ-পত্রঝরা বৃক্ষ। গাছ উচ্চতায় সাধারণত ১০-১২ মিটার উঁচু হয়ে থাকে। গাছের শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত, কাঠ শক্ত মানের, নানাবিধ কাজে ব্যবহার হয়, বাকল রঙে সবুজাব-ধূসর। পাতা রঙে গাঢ় সবুজ, আকারে ডিম্বাকৃতির, লম্বায় ১৪-১৫ সেন্টিমিটার, চওড়ায় ৭-৮ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।
বাতাবি লেবু গাছে ফুল ফোটার মৌসুম বসন্তকাল, অর্থাৎ (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) মাস। ফুটন্ত ফুলে থাকে আকুল করা ঘ্রাণ। বসন্তের বাতাসে বাতাবি লেবু ফুলের ঘ্রাণ ভেসে চলে দূর থেকে বহু দূর। শাখা-প্রশাখার অগ্রভাবে গুচ্ছাকারে ফুল ধরে। ফুলে মাংসল বৃত্যাংশ ৪ থেকে ৫টি, রঙে সাদা, মাঝে হলুদ রঙের পরাগ এবং গর্ভদণ্ড থাকে। ফল পরিপক্ক বা পাকতে শুরু করে আগস্ট মাস থেকে এবং ফল পাওয়া যায় নভেম্বর মাস পর্যন্ত।
ফল আকারে গোলাকার থেকে ডিম্বাকার, কচি ফল রঙে গাঢ় সবুজ, পাকা ফল রঙে হালকা সবুজ থেকে হলুদ রঙের হয়। শাখা-প্রশাখার অগ্রভাগে গুচ্ছাকারে বা একক ভাবে ফল ধরে। ফলের উপরি অংশে বেশ পুরু খোসা, ভেতরের অংশে থাকে জাতভেদে সাদা, লালচে কিংবা গোলাপি রঙের রসালো-নরম শাঁস বা কোয়া এবং বীজ। বীজ আকারে চ্যাপ্টা, রঙে সাদাটে।
ফল স্বাদে টক-মিষ্টি। ফল ওজনে সাধারণত ১ থেকে ২ কেজি পর্যন্ত ওজন হয়ে থাকে। বীজ ও কলম চারার মাধ্যমে বংশ বিস্তার সম্ভব। বীজের গাছে ফল ধরতে ৫-৭ বছর সময় লাগে, অন্যদিকে কলম চারার গাছে দ্রুত সময়ের মাঝে ফুল-ফল ধরে।
রৌদ্রোজ্জ্বল পানি নিকাশের উত্তম ব্যবস্থা সম্পন্ন উঁচু থেকে মাঝারি উঁচু ভূমি ও প্রায় সব ধরনের মাটিতে বাতাবি লেবু জন্মে। তবে মধ্যম অম্লীয় উর্বর দো-আঁশ থেকে পলি মাটিতে বেশি ভালো জন্মে।
স্থানীয় জাতের পাশাপাশি আমাদের দেশে বাতাবি লেবুর যে সকল উন্নত জাত রয়েছে তার মাঝে- বারি বাতাবি লেবু-১, বারি বাতাবি লেবু-২, বারি বাতাবি লেবু-৩, বারি বাতাবি লেবু-৪, বারি বাতাবি লেবু-৫, বারি বাতাবি লেবু-৬, বাউ জাম্বুরা-১ ও বাউ জাম্বুরা-২ উল্লেখযোগ্য। তাছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের দেশে থাই বারোমাসি জাতের বাতাবি লেবুর জাতও সম্প্রসারণ হচ্ছে।
বাতাবি লেবু ফলের রয়েছে নানাবিধ উপকারিতা ও পুষ্টিগুণ। সরাসরি ফল হিসেবে খাওয়া যায়, লবণ-মরিচ, গুড়-চিনি ও কাসুন্দি মিশিয়ে ভর্তা করে খাওয়া যায়। তাছাড়া জুস তৈরি করেও খাওয়া যায়।
বাতাবি লেবু ফলে বিদ্যমান রয়েছে খনিজ পদার্থ, খাদ্যশক্তি, আমিষ, শর্করা, প্রোটিন, ক্যালসিয়াম, পটাসিয়াম, ফসফরাস, আয়রন, লৌহ, ক্যারোটিন, সোডিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, ম্যাংগানিজ, থায়ামিন, নিয়াসিন, রিবোফ্লাভিন, ভিটামিন বি-১, ভিটামিন বি-২ ও ভিটামিন-সি উল্লেখযোগ্য। তবে বেশি পরিমাণে পাওয়া যায় ক্যালসিয়াম, ক্যারোটিন ও ভিটামিন-সি।
বাতাবিলেবু ফলের উপকারি দিগুলোর মাঝে- জ্বর-সর্দি ও কাশি নিরাময় করে, কোষ্ঠকাঠিন্য দূর করে ও হজম শক্তি বৃদ্ধি করে, মুখের অরুচি দূর করে ও রুচি বৃদ্ধি করে, রক্তনালির সংকোচন ও প্রসারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, শরীরের অতিরিক্ত ওজন কমাতে সাহায্য করে, নিদ্রাহীনতা দূর করে, মুখের ঘাঁ ও শরীরের অন্যান্য স্থানের ক্ষত সারাতে সাহায্য করে, ত্বক ও চুল সজীব রাখে, শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, হৃদরোগ ও ক্যানসারের ঝুঁকি কমায়, রক্তের কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণে রাখে এবং দাঁতের মাড়ি ও হাড় মজবুত করে। তাছাড়া বাতাবি লেবুর পাতা, ফুল ও ফলের খোসা গরম পানিতে সেদ্ধ করে পান করলে মৃগী রোগ, হাত-পা কাঁপা রোগ ও অতিরিক্ত কাশি জনীত সমস্যায় ফলদায়ক।
# নূর আলম গন্ধী (উদ্ভিদ-কৃষি ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক)