সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে প্রিয় ঘোড়ার হত্যাকারীদের ক্ষমা করতে চান মনু মিয়া

বিশেষ প্রতিবেদক | এক্সক্লুসিভ
মে ২২, ২০২৫
সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে প্রিয় ঘোড়ার হত্যাকারীদের ক্ষমা করতে চান মনু মিয়া

ঘোড়াটির নাম ‘বাহাদুর’। বাহাদুরের মতোই সে তার সওয়ারিকে নিয়ে ছুটতো হাওরের গ্রাম থেকে গ্রামে। সে যাত্রায় থাকতো বিষাদময় আবেগ আর ভালোবাসা। তার সওয়ারির অপেক্ষায় যে স্বজনহারা মানুষ। সময়মতো সওয়ারিকে নির্ধারিত গন্তব্যে পৌঁছে সাজাতে হবে শেষ ঠিকানা। টানা ৪৯ বছর ধরে অকৃত্রিম আবেগে যিনি নিজেকে নিবেদিত রেখেছেন শেষ ঠিকানা সাজানোর কাজে।

নিজ গ্রাম বা দূরবর্তী গ্রাম, যেখান থেকে যখনই কারো মৃত্যু সংবাদ পান, ঘোড়াটির পিঠে হাতিয়ার-যন্ত্রের বস্তাটা তুলে আবেগতাড়িত দরদ নিয়ে ছুটে যান মনু মিয়ার নামের এই সওয়ারী। শেষ ঠিকানার কারিগর হিসেবে যার রয়েছে ব্যাপক সুনাম ও পারদর্শিতা।

মনু মিয়ার মতোই ‘বাহাদুর’ও তাই প্রিয় হয়ে ওঠে হাওর জনপদের আপামর মানুষের কাছে। মনু মিয়া তার হাতিয়ার-যন্ত্রের বস্তা নিয়ে যখন ঘোড়ার পিঠে সওয়ার হয়ে ছুটতেন, সবাই বুঝতেন- নিশ্চয়ই কেউ মারা গেছেন!

নিঃসন্তান মনু মিয়ার সন্তানসময় সেই ঘোড়াটিই এবার বর্বরতার বলি হয়েছে! বেদম পেটানোর পর বুকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করে ঘোড়াটিকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর ঘোড়াটির নিথর দেহ ফেলে রাখা হয় একটি জমির ছিপছিপে পানির মধ্যে।
গত শুক্রবার (১৬ মে) সকালে যখন মৃত অবস্থায় ঘোড়াটিকে সনাক্ত করা হয়। তখনও ঘোড়াটির বুক থেকে রক্ত ঝরছিল আর সেই রক্ত মিশে লাল হয়ে ওঠে জমির পানি।

ঘোড়াটিকে নির্মমভাবে মেরে ফেলার খবর রবিবার (১৮ মে) পর্যন্ত জানানো হয়নি তার সওয়ারী মনু মিয়াকে। কেননা মনু মিয়া নিজেই রয়েছেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।

রাজধানীর ধানমণ্ডিতে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক রকম মুমূর্ষু অবস্থায় চিকিৎসাধীন রয়েছেন তিনি। মনু মিয়ার এমন সংকটকালে তার প্রিয় ঘোড়াটিকে নৃশংসভাবে মেরে ফেলার ঘটনাটি মানুষকে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়।

নেটিজেনরা সরব হন বোবা প্রাণিটির সঙ্গে ঘটে যাওয়া বর্বরতার বিরুদ্ধে। নিরীহ প্রাণিটিকে হত্যার ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না এলাকাবাসীসহ বিবেকবান মানুষেরা। অনেকেই মনু মিয়াকে ঘোড়া কিনে দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করছেন।

ঘোড়াটিকে হত্যার ঘটনার সঙ্গে জড়িতরাও মনু মিয়ার স্বজন ও গ্রামবাসীদের দুঃখ প্রকাশ করছেন। তারা মনু মিয়াকে একটি ঘোড়া কিনে দেওয়ার কিংবা ক্ষতিপূরণ যেটিতেই সবাই সম্মত হয়, সেটি করতে চাচ্ছেন।

এ রকম পরিস্থিতিতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মনু মিয়া সোমবার (১৯ মে) সকালে কিছুটা সুস্থ বোধ করলে স্বজনদের মাধ্যমে তাকে জানানো হয় বিষয়টি। সবকিছু শুনে মনু মিয়া ঘোড়াকে মেরে ফেলার বিষয়টি জানতে ফোন দেন বাড়িতে বাহাদুরের পরিচর্যার দায়িত্ব দিয়ে আসা মহব্বতকে। মহব্বত আমতা আমতা করে খুলে বলে সব কিছু। কিছুক্ষণের জন্য নিরব হয়ে যান মনু মিয়া। পথের সাথী ‘বাহাদুর’ এর জন্য চোখ থেকে অশ্রু নামে। পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নেন।

স্ত্রী রহিমা বেগমকে মনু মিয়া জানান, কেউ যেন তার বাহাদুরের জন্য কোনো ক্ষতিপূরণ না নেয়। বাহাদুরের বিনিময়ে তিনি নতুন কোনো ঘোড়াও চান না। বেঁচে থাকলে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে জায়গা জমি বিক্রি করে আরেকটি ঘোড়া কিনে নিবেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই যেনো ঘোড়া কিংবা ক্ষতিপূরণ নেওয়া না হয়।

মনু মিয়া বলেন, “আমার শুধু একটাই ইচ্ছা আছে। আল্লাহ যদি আমাকে সুস্থ করে বাড়িতে নেয়, তখন যেনো আমার ঘোড়াটিকে যারা মেরেছে তারা আসে। তাদের সাথে একটি ছবি তুলে আমি তাদেরকে মাফ করে দিতে চাই।”

বিষয়টি সবাইকে সেভাবেই জানিয়ে দেন রহিমা বেগম। ক্ষমা করে দেওয়ার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের মাধ্যমে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়ও মনু মিয়া আরেকবার তার মহানুভবতার পরিচয় দিয়েছেন। যেন এই পৃথিবীকে তিনি দু’হাত ভরে শুধু দিতেই এসেছেন, নিতে নয়।
মনু মিয়া শেষ ঠিকানার একজন নিপূণ কারিগর। মনের গহীনের পরম দরদ আর অপার ভালোবাসা দিয়ে তিনি সাজান মুসলিম সম্প্রদায়ের শেষ ঠিকানা- কবর। কারো মৃত্যু সংবাদ কানে আসামাত্রই কুন্তি, কোদাল, ছুরি, করাত, দা, ছেনাসহ সহায়ক সব যন্ত্রপাতি নিয়ে ছুটে যান কবরস্থানে। মানুষের অন্তিম যাত্রায় একান্ত সহযাত্রীর মতো তিনি বাড়িয়ে দেন তার আন্তরিক দু’হাত।

এভাবেই কবর খননের কাজ করে তিনি পার করে দিয়েছেন তাঁর ৬৭ বছরের জীবনের সুদীর্ঘ ৪৯টি বছর। কোন ধরনের পারিশ্রমিক কিংবা বকশিস না নিয়ে এ পর্যন্ত খনন করেছেন ৩ হাজার ৫৭টি কবর। ব্যতিক্রমী পন্থায় মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ সেবাপরায়ণতার এক অনন্য প্রতীক হয়ে ওঠা মনু মিয়া কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর উপজেলা ইটনার জয়সিদ্ধি ইউনিয়নের আলগাপাড়া গ্রামের বাসিন্দা।

একজন নিখুঁত সুদক্ষ গোরখোদক হিসেবে মনু মিয়ার সুনাম রয়েছে দুর্গম হাওর উপজেলা ইটনা, মিঠামইন, শাল্লা, আজমিরীগঞ্জসহ পার্শ্ববর্তী এলাকাসমূহে। দূরের যাত্রায় দ্রুত পৌঁছাতে নিজের ধানীজমি বিক্রি করে বেশ কয়েক বছর আগে কিনেছিলেন ঘোড়াটিকে। আদর করে নাম দিয়েছিলেন, ‘বাহাদুর’।

এই ঘোড়ার পিঠে তিনি তুলে নিতেন তার যাবতীয় হাতিয়ার-যন্ত্র। সেই ঘোড়ায় সওয়ার হয়েই শেষ ঠিকানা সাজাতে মনু মিয়া ছুটে চলেন গ্রাম থেকে গ্রামে। ঘোড়াটিই যেন তার বয়সের বাধা অতিক্রম করে দিয়ে তাকে সচল রেখে চলেছিলো।

নানা জটিল রোগে কাবু হয়ে সম্প্রতি শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন তিনি। এ রকম পরিস্থিতিতে গত ১৪ মে তাকে রাজধানীর ধানমণ্ডিতে বাংলাদেশ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানেই চিকিৎসা চলছে নিঃসন্তান মানুষটির। স্ত্রী রহিমা বেগম স্বামীর পাশে রয়েছেন ছায়ার মতো।

এক্সক্লুসিভ'র অন্যান্য খবর

প্রধানমন্ত্রীর সফরের পরদিনই সুখবর পেলেন পাকুন্দিয়াবাসী

প্রধানমন্ত্রীর সফরের পরদিনই সুখবর পেলেন পাকুন্দিয়াবাসী

হাওরে ডাকাত দমনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিলেন প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম

হাওরে ডাকাত দমনে কঠোর হওয়ার নির্দেশ দিলেন প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম

কিশোরগঞ্জে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণী

কিশোরগঞ্জে বিশ্ব পরিবেশ দিবসের আলোচনা ও পুরস্কার বিতরণী

পাগলা মসজিদের দানবাক্সে নতুন রেকর্ড, এবার মিললো সর্বোচ্চ ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা

পাগলা মসজিদের দানবাক্সে নতুন রেকর্ড, এবার মিললো সর্বোচ্চ ১৫ কোটি ৯০ লাখ ৮০ হাজার ১৪৬ টাকা

পাগলা মসজিদের দানসিন্দুকে পাওয়া গেলো রেকর্ড ৪৩ বস্তা টাকা

পাগলা মসজিদের দানসিন্দুকে পাওয়া গেলো রেকর্ড ৪৩ বস্তা টাকা

কিশোরগঞ্জে পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ১৫৫ জন শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে

কিশোরগঞ্জে পাঁচ লাখ ২৬ হাজার ১৫৫ জন শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হবে

পাকুন্দিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় ভাঙচুর-লুটপাটের প্রতিবাদে কিশোরগঞ্জে মানববন্ধন, স্মারকলিপি

পাকুন্দিয়ায় মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কার্যালয় ভাঙচুর-লুটপাটের প্রতিবাদে কিশোরগঞ্জে মানববন্ধন, স্মারকলিপি

কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে রোগীর স্বজনকে মারধরের অভিযোগ তদন্তে কমিটি

কিশোরগঞ্জ সদর হাসপাতালে রোগীর স্বজনকে মারধরের অভিযোগ তদন্তে কমিটি

সর্বশেষ