বিলুপ্তপ্রায় কিশোরগঞ্জের টাবা লেবু

নূর আলম গন্ধী | কৃষি
আগস্ট ২৪, ২০২৬
বিলুপ্তপ্রায় কিশোরগঞ্জের টাবা লেবু

আমাদের দেশে নানাবিধ জাতের লেবু উৎপাদিত হয়, এর মাঝে বিশেষ বৈশিষ্টের ফলে বেশ কিছু জাতের লেবু জনপ্রিয়তা পাওয়ার পাশাপাশি রয়েছে এর খ্যাতি ও বিশেষ পরিচিতি। অন্যদিকে এসব জাতের লেবুর বেলায় কিছু কিছু জাতের লেবুর উৎপাদন এলাকা একটি সুনিদ্দিষ্ট এলাকাকেন্দ্রিক এবং এর বাহিরে দেশের অন্যান্য স্থানে উৎপাদিত হলেও হয়তো-বা তা অল্প পরিসরে বা বিক্ষিপ্ত ভাবে এর উৎপাদন লক্ষ করা যায়।

আজকের এ লেখার মাধ্যমে আমি তুলে ধরতে চাচ্ছি কিশোরগঞ্জের মাটিতে জন্মে ঠিক তেমনই একটি জাতের লেবুর জাত পরিচিতি ও এর বৈশিষ্ট যে লেবুটি বহুকাল আগে থেকে কিশোরগঞ্জের মাটিতে জন্মে এবং তা কিশোরগঞ্জের নানা উপজেলায় বিশেষ করে উঁচু ও সমতল উপজেলাগুলোতে কম-বেশি এ জাতের লেবুর গাছ চোখে পড়ে এবং উল্লেখ্য যে, অতীতের একটা সময়ে খোঁজ নিলে দেখা যেতো প্রায় অনেকের বসতবাড়িতে এ জাতের লেবু গাছ পাওয়া যেতো।

তবে পরিতাপের বিষয় সাম্প্রতিক সময়ে এ লেবুর চাষ বহুলাংশে কমে গেছে এবং খুব একটা চোখে পড়ছে না। বলা চলে বিলুপ্তির পথে হাঁটছে। এর অন্যতম কারণ হিসেবে চিহিৃত করতে গিয়ে যে সকল বিষয় ওঠে এসেছে তার মাঝে অন্যতম কারণগুলো হলো- এ জাতের লেবুর জাতটি কারো নজরে না আসা ও এর সম্প্রসারণ উদ্দোগ না নেয়া, অন্যান্য আরো জাতের লেবুর মতো এ জাতের গাছে একটু দেরিতে ফলন আসা এবং তুলনামূলক কম পরিমাণে লেবু ধরা, গাছ আকারে বড় হওয়াতে বেশি জায়গা লাগে, বসতবাড়িতে স্থান সঙ্কট এবং অজ্ঞতা ও অবহেলা।

তবে এর জাতকে টিকিয়ে রাখতে এর থেকে কলম চারার গাছ উৎপাদন করে সম্প্রসারণ উদ্দোগ হাতে নিয়ে ও এর গুণাগুণ সম্পর্কে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে পারলে এখনও একে বিলুপ্তির হাত থেকে বাঁচানো সম্ভব হবে বলে মনে করি এবং এ আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

আসুন এবার জানি এ জাতের লেবুর জাত বৈশিষ্ট ও পরিচিতি। লেবুটি কিশোরগঞ্জের অধিকাংশ মানুষের কাছে টাবা লেবু নামে পরিচিত। তবে কিছু কিছু মানুষের কাছে আবার এটি জাম্বি লেবু নামেও পরিচিত। লেবুটি দেখতে এর আকার জাম্বুরা বা বাতাবিলেবু সদৃশ বলে এ নামে নামকরণ।

এ জাতের লেবুর পাতা আকারে লেবু পাতার মতো ছোট নয়, এর পাতা বাতাবিলেবু পাতা সদৃশ, ঘ্রাণযুক্ত, রঙে সবুজ, পুরু, আকারে ডিম্বাকার। তাছাড়া এ জাতের লেবুর গাছের গড়ন, কাণ্ড, পাতা ও শাখা-প্রশাখার বিন্যাস অন্যান্য সাধারণ লেবু গাছের মতো নয় অবিকল বাতাবিলেবু গাছ সদৃশ। পাতা লম্বায় সাধারণত ১৪-১৫ সেন্টিমিটার এবং চওড়ায় ৭-৮ সেন্টিমিটার হয়ে থাকে।

গাছ সোজা উপরের দিকে বাড়তে থাকে এবং বেশ অনেকটা উপরে গিয়ে শাখা-প্রশাখা ছড়ায়, শাখা-প্রশাখায় কাঁটা থাকে। শাখা-প্রশাখাজুড়ে একক বা গুচ্ছাকারে ফুল-ফল ধরে। প্রতি গুচ্ছে ২-৪ টি লেবু ধরতে দেখা যায়। গাছ উচ্চতায় সাধারণত ১০-১৫ ফুট উঁচু হয়ে থাকে। গাছের কাঠ শক্ত মানের, বাকল রঙে সবুজাব-ধূসর।

ফল পরিপক্ক হয় অন্যান্য লেবুর তুলনায় বেশ অনেকটা দেরিতে অর্থাৎ জুলাই-আগস্ট মাসে এবং ফল পাওয়া যায় অক্টোবর মাস পর্যন্ত। ফল আকারে গোলাকার থেকে ডিম্বাকার, কচি ফল রঙে গাঢ় সবুজ, পরিপক্ক ফল রঙে হালকা সবুজ। ফলের উপরের অংশে থাকে সুঘ্রাণযুক্ত মসৃণ খোসা এবং ভেতরের অংশে থাকে সাদাটে রঙের শাঁস ও বীজ। উল্লেখ্য যে, এ জাতের লেবুতে বীজের পরিমাণ খুব বেশি থাকে না, তাছাড়া বীজ আকারে বড়, রঙে সাদাটে, বাতাবিলেবু বীজ সদৃশ এবং চ্যাপ্টা হয়। ফল ওজনে সাধারণত ৬০০ গ্রাম থেকে ৯০০ গ্রাম পর্যন্ত ওজন হয়ে থাকে।

বীজ ও কলম চারার মাধ্যমে বংশ বিস্তার সম্ভব। তবে বীজের গাছে ফলন ধরতে ৫-৬ বছর সময় লাগে অন্যদিকে কলম চারার গাছে দ্রুত সময়ের মাঝে ফুল-ফল ধরে। প্রায় সব ধরনের মাটিতে জন্মে। তবে রৌদ্রোজ্জ্বল পানি নিকাশের উত্তম ব্যবস্থা সম্পন্ন উঁচু থেকে মাঝারি উঁচু ভূমি ও প্রায় সব ধরনের মাটিতে এ জাতের লেবু জন্মে। তবে মধ্যম অম্লীয় এবং উর্বর দো-আঁশ থেকে বেলে দো-আঁশ মাটিতে বেশি ভালো জন্মে।

আমরা জানি লেবু ভিটামিন ‘সি’ সমৃদ্ধ ফল। তবে এলাকার মানুষের মাঝে জনশ্রুতি আছে যে, টাবা লেবুর বিশেষ উপকারী দিকের মাঝে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এ লেবুর রসে তৈরিকৃত শরবত ও লেবুর ভর্তা ভাইরাসজনীত তীব্র জ¦র নিবারণে ও মুখের রুচি ফিরাতে বিশেষ উপকারী। আর তাছাড়া এ জাতের লেবু শরবত হিসেবেই অধিক ব্যবহৃত হয় এবং বলা চলে শরবত হিসেবে খাওয়ার জন্যই এ লেবু চাষ করা হয়ে থাকে।

টাবা লেবু ফলের ছবিটি ক্যামেরাবন্দি করি কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের নন্দিপুর গ্রামের আবুসাইদ মিয়ার বসতবাড়ি থেকে।

# নূর আলম গন্ধী, উদ্ভিদ-কৃষি ও প্রকৃতি বিষয়ক লেখক

কৃষি'র অন্যান্য খবর

সর্বশেষ